আজ বিশ্ব মা দিবস

সম্পাদকীয় ডেস্ক । কাগজটোয়েন্টিফোরবিডি.কম

মা দিবস’ অর্থ: সারা দিন, দিনমান, অহোরাত্র। তাই মা দিবস অর্থ দাঁড়ায়, মার জন্য একটি পুরো দিন। অর্থাৎ বছরের এক দিন মায়ের জন্য নিবেদন করবেন। তাঁর সেবায় কাটাবেন। তাঁকে খুশী রাখবেন। সেই দিনটিতে তাঁর পাশে থাকবেন। বিভিন্ন কার্য-কলাপের মধ্য দিয়ে সেই দিনটি পালন করবেন। কিছু লোকের পরিভাষায় একেই বলা হচ্ছে মা দিবস।

বছর ঘুরে আবার এলো মে মাস। এ মাসের দ্বিতীয় রোববারে ১২ই মে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘটা করে পালিত হচ্ছে “মা দিবস’ । এ দিবসকে উপলক্ষ্য করে দোকানীরা তাদের পশরা সাজিয়েছেন, “মা দিবস’ এর বিশেষ মগ, চকলেট, লকেট, শোপিস, টিশার্ট আরো কতো কি? তাদের গায়ে লেখা থাকে “মা তুমি কতো মিষ্টি”, কিংবা “তুমিই সবচেয়ে লক্ষ্মী মা”, “মা তোমাকে অনেক ভালোবাসি” ইত্যাদি নানা রকম মিষ্টি মধুর কথা। ছেলেমেয়েদের মনের কথাই দোকানীরা তুলে রেখেছে তাদের পন্যের গায়ে। যে কথাটা হাজারো কাজের ভীড়ে দিনে হয়তো লক্ষ বার মনে পড়ে কিন্তু বলি বলি করেও মাকে বলা হয়ে উঠে না, সেটিই তখন মগ কিংবা চকলেটের মধ্যে দিয়ে মায়ের কাছে পৌঁছে দেই আমরা।

বিশ্ব ‘মা’ দিবসের ইতিহাস-

‘মা’ ত্রি-ভুবনের সবচেয়ে মধুরতম শব্দ। মায়ের মমতা, ত্যাগ ও মর্যাদা স্মরণ করার দিন। মা, যিনি কোনো শর্ত ছাড়াই সন্তানদের ভালোবাসেন এবং সন্তানদের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার আজ ‘মা দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। গর্ভে ধারণ করে পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখানো থেকে শুরু করে বেড়ে ওঠা এমনকি প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত প্রতি পদে পদে সন্তানকে সাহস, উৎসাহ ও ভরসা দেন মা। মায়ের ঋণ শোধ করা যাবে না কখনোই। মাকে ভালোবাসা জানাতে বছরের সব কটি দিনও যথেষ্ট নয়। তবুও এই একটি দিন মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় মায়ের মমতা, ত্যাগ ও মর্যাদার কথা। ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রাচীন গ্রিসে প্রথম ‘মা দিবসের’ প্রচলন শুরু হয়। সেখানে প্রতি বসন্তকালে একটি দিন দেবতাদের মা ও ক্রোনাসের সহধর্মিণী ‘রিয়া’র উদ্দেশে উদযাপন করা হতো। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় ‘মা দিবস’ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পালিত হতো। রোমানরা পালন করতেন ১৫ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যে। তারা দিনটিকে উৎসর্গ করেছিলেন ‘জুনো’র প্রতি। ১৬০০ শতাব্দী থেকে যুক্তরাজ্যেও ‘মাদারিং সানডে’ হিসেবে এ দিনটি উদযাপন শুরু হয়। ইস্টার সানডের ঠিক ৩ সপ্তাহ আগের রোববার এটি পালন করেন তারা। নরওয়েতে ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় রোববারে, সৌদি আরব, বাহরাইন, মিসর, লেবাননে বসন্তের প্রথম দিন অর্থাৎ ২১ মার্চ এ দিনটি উদযাপিত হতো। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ‘মা দিবস’র বর্ণাঢ্য উদযাপন মূলত আমেরিকানরা শুরু করেন। ১৮৭০ সালে সমাজসেবী জুলিয়া ওয়ার্ড হো আমেরিকার নারীদেরকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান। সেইসঙ্গে দিবসটিকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য রাষ্ট্রের কাছে প্রচুর লেখালেখি করেন। এ সময় অ্যান জার্ভিস দিনটির সরকারি অনুমোদন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের চেষ্টা চালাতে থাকেন। কিন্তু সফলকাম হতে পারেননি তিনি। তার মৃত্যুর পর তার মেয়ে অ্যানা জার্ভিস মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণের কাজে হাত দেন। তিনি চেষ্টা করতে লাগলেন একটি বিশেষ দিন ঠিক করে ‘মা দিবস’টি উদযাপন করার জন্য। সে লক্ষ্যেই ১৯০৮ সালের ১০ মে তিনি পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফিটন শহরের সেই চার্চে, যেখানে তার মা অ্যান জার্ভিস রোববারে পড়াতেন সেখানে প্রথমবারের মতো দিনটি উদযাপন করেন। এরপর থেকেই আস্তে আস্তে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিস্তার হতে থাকে।

এই দিনটির সূত্রপাত প্রাচীন গ্রীসের মাতৃ আরাধনার প্রথা থেকে। গ্রিক দেবতাদের মধ্যে এক বিশিষ্ট দেবী সবিলে-এর উদ্দেশ্যে পালন করা হত এই উৎসব। এশিয়া মাইনরে মহাবিষ্ণর -এর সময়ে এবং তারপর রোমে আইডিস অফ মার্চ (১৫ই মার্চ) থেকে ১৮ই মার্চের মধ্যে এই উৎসবটি পালিত হত।

প্রাচীন রোমানদের ম্যাত্রোনালিয়া নামে দেবী জুনোর প্রতি উৎসর্গিত আরও একটি ছুটির দিন ছিল, সেদিন মায়েদের উপহার দেওয়া হত।

মাদারিং সানডের মতো ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যে দীর্ঘকাল ধরে বহু আচার-অনুষ্ঠান ছিল যেখানে মায়েদের এবং মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট রবিবারকে আলাদা করে রাখা হত। মাদারিং সানডের অনুষ্ঠান খ্রিষ্টানদের অ্যাংগ্লিকানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পঞ্জিকার অঙ্গ। ক্যাথলিক পঞ্জিকা অনুযায়ী একটিকে বলা হয় লেতারে সানডে যা লেন্টের সময়ে চতুর্থ রবিবারে পালন করা হয় ভার্জিন মেরি বা কুমারী মাতার ও “প্রধান গির্জার” সম্মানে প্রথানুযায়ী দিনটিকে সূচিত করা হত প্রতীকী উপহার দেওয়া এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রান্না আর ধোয়া-পোছার মত মেয়েদের কাজগুলো বাড়ির অন্য কেউ করার মাধ্যমে।’

ইসলামের দৃষ্টিতে এই দিবস-

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ইসলাম আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখার আদেশ দেয়। তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং সম্পর্কচ্ছেদ থেকে সতর্ক করে। তবে সদ্ব্যবহারের শ্রেষ্ঠতা মায়ের জন্য নিবেদন করে, মাকেই বেশী হকদার মনে করে এবং পিতা-মাতা সহ সকল আত্মীয়ের সাথে ধারাবাহিক অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কের আদেশ দেয়। তাই মায়ের সেবার জন্য কোন একদিন নির্দিষ্ট করা আর অন্য দিনে গুরুত্ব না দেয়া ইসলাম স্বীকার করে না। যেমন এটা মায়ের জন্য স্বীকার করে না। অনুরূপভাবে পিতা সহ অন্যান্য আত্মীয়দের সাথেও সমীচীন মনে করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:

و قضى ربّك ألا تعبدوا إلاّ إيّاه و بالوالدين إحسانا

“তোমার প্রতিপালক হুকুম জারি করেছেন যে, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না, আর পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।” [সূরা ইসরা/২৩]

তিনি আরও বলেন:

وَ وَصّيْنا الإنسانَ بوالديهِ حملته أمّه وهْناً على وهنٍ و فصاله في عامينِ أن اشكر لي ولوالديك إليّ المصير

“মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে, (নির্দেশ দিচ্ছি) যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতামাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই কাছে।” [সূরা লোকমান/১৪]
মহান আল্লাহ আরও বলেন:

“ক্ষমতা পেলে সম্ভবত: তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে আর আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, অতঃপর তাদের বধির করেন আর তাদের দৃষ্টি শক্তিকে করেন অন্ধ।” [সূরা মুহাম্মদ/২২-২৩]

একদা এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করেন:

” من أحق الناس بحسن صحابتي؟ قال أمك، قال ثم من؟ قال: ثم أمك، قال: ثم من؟ قال: ثم أمك، قال: ثم من؟ قال ثم أبوك.”

“আমার ভাল ব্যবহারের সবচেয়ে বেশী হকদার কে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমার মা। সে লোক বলল: তারপর? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবার বললেন: তোমার মা। সেই লোক বলল: অতঃপর? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তোমার মা। অতঃপর তোমার পিতা।” [বুখারী, অধ্যায়,আয়াত নং ৫৯৭১]

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন:

” لا يدخل الجنة قاطع” رواه البخاري

“আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” [বুখারী, অধ্যায়, আয়াত নং ৫৯৮৪]

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আল্লাহ তায়ালা আত্মীয়তা-সম্পর্ককে সম্বোধন করে বলেন:

“যে তোমাকে বহাল রাখে আমিও তার সাথে সম্পর্ক বহাল রাখব; আর যে তোমার হতে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আমিও তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করব এতে কি তুমি খুশী নও? সে বলল, নিশ্চয়, হে আমার প্রভু। আল্লাহ বললেন, যাও, তোমার জন্য তাই করা হল।” [বুখারী, অধ্যায়,আয়াত নং ৫৯৮৭]

উপরে বর্ণিত কুরআনের তিনটি আয়াত ও তিনটি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পিতা-মাতা উভয়ের সম্মান করা এবং তাঁরা দু জন সহ সকল আত্মীয়দের সাথে আত্মীয়তা-সম্পর্ক বজায় রাখা সর্বাবস্থায় জরুরী করেছেন এবং তা ছিন্ন করাকে বড় গুনাহ, আল্লাহর ক্রোধ তথা জাহান্নামে প্রবেশের কারণ করেছেন।

তাই বছরের ৩৬৪ দিনকে উপেক্ষা করে কেবল ১টি দিন মায়ের জন্য নির্ধারণ করা এবং পিতা সহ সকল আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক না রাখা বা অবহেলা করা এটা পাশ্চাত্যদের শোভা দেয় কোন মুসলিমকে নয়।

সবশেষে এই কবিতা দিয়ে শেষ করতে চাই –

MY DEAR MOM
Anonymous

Mom, I loved you yesterday, I love you tomorrow and everyday.

You were there for me my first day of school, to hold my hand and give me courage to go.

You listened to me when I needed to talk, you talked to me when I needed to listen.

You let me grow and learn from my own mistakes.

You never left my side when I was feeling down, I knew you would be there to pick me up.

মাহবুব এইচ শাহীন/প্রকাশক ও সম্পাদক/কাগজ২৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!