সেলিনা জাহান প্রিয়ার গল্প: ‘অ-মানব’- (২৬ তম পর্ব)

 

‘অ-মানব’- (২৬ তম পর্ব)

——————–সেলিনা জাহান প্রিয়া

 

পাগল মানুষটা হেঁটেই চলছে । কোথায় কখন যায় কেউ জানে না। কত দিন হাঁটবে কে জানে । ট্রাক চালক সাবু তার মেয়ের জন্য বেদেনাকে মা হিসাবে পছন্দ করেছে । সাবুর মা মুসা মিয়া কে বলে ভাই আমার ছেলের জন্য আপনার মেয়েটাকে দিয়ে দেন । আমার নাতনিটা একজন মা পাবে । মুসা মিয়া বলে আপা কপালে থাকলে হবে । আমি আমার মেয়ে কে নিয়ে ঢাকা যাব । আপনাদর সাথে তো দেখা হয় নাই ।

আপনার ছেলে কে যে লোকটা এখানে এনে সেবা করেছে । সে আপনি আসার আগেই চলে গেছে । একটা চমৎকার মানুষ । যাবার সময় বলে গেল আমি যেনো মেয়েটাকে মানুষ বানাই । তাকে যেন হাতের কাজ সেখাই । আমি মরে গেলে যেন আমার মেয়েটি কাজের মধ্যে তার জীবন গড়ে তুলতে পারে । আমার মেয়ে স্বামী মারা যাবার পড় তার একবেলা ভাত জুটে নাই । কাজ মানুষ কে বাচিয়ে রাখে । আমি কেমন বোকা মানুষ । আমি মেয়ে কে পাহারা দিচ্ছি কিন্তু আমি মরে গেলে কে পাহারা দিবে । ঐ মানুষটা বলে গেল আমি যেন তাকে হাতের কাজ শিখাই । সাবুর মা বলল – আপনার মেয়ে কে আমার পছন্দ আর আমার নাতনী দেখেন কি সুন্দর করে বেদেনার সাথে মিশে গেছে । মুসা মিয়া বলল – কপালে থাকলে হবে । হুট করে তো আর সমন্ধ হয় না। বিকেল বেলা ট্রাক চালক সাবু তার মা আর মেয়ে কে নিয়ে মুসা মিয়ার বাড়ি হতে বিদায় নেয় । বেদেনা মেয়েটার জন্য তার চোখের পানি মুছে কাপড়ের আঁচল দিয়ে । সাবু তার মোবাইল নাম্বার দিয়ে যায় । বলে আমার মেয়ের সাথে মনে চাইলে একটু কথা বল । সাবু তার মাকে বলে মা গো মেয়েটার হাতের রান্না খুব মজা । সাবুর মা বুঝতে পারে ছেলের খুব পছন্দ হয়েছে বেদেনাকে ।।
কিছু দিন পড় বেদনা কে নিয়ে মুসা মিয়া আবার ঢাকা চলে আসে । মাঝে মাঝে সাবু
কে বেদেনা ফোন করে । বেদেনার বাবা বেদেনাকে সেলাই এর কাজ সিখতে দিয়েছে ।
মুসা মিয়া এখন ফলের ব্যবসা করে । বেদেনা একদিন তার বাবা কে বলে – বাবা ঐ যে একটা মানুষ আসছিল যার কথায় তুমি আমাকে নিয়ে ঢাকা আসলা ঐ মানুষটা ঠিক কথা বলছে । আমার সাথে যে সকল মেয়ে কাজ শিখছে তারা সবাই এই কাজ শিখে নাকি চাকুরি নিবে । আমিও চাকুরি করব ।। নিজের আয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াব । বেদেনা আজ কাল আর সাবুর ফোন ধরে না। কিছু মানুষের পরিচয় এমনেই হয় । তারা সময়ে কাছে আসে সময়ে দূরে চলে যায় কিছুটা সময় মায়া লাগায় ।
নাদিয়া প্রায় পুকুর পারে এসে দাড়ায় । পুকুরের চার পাশের পরিবেশ টা অনেক সুন্দর । কিন্তু একটা বিষয় নাদিয়া লক্ষ্য করে দেখছে যে শিমুল গাছটা দিন দিন মরে যাচ্ছে ।
অনেক দিন পড় হুজুর আজ এসেছে । নাদিয়া বলল- মিয়াছাব দেখেন শিমুল গাছটা মরে যাচ্ছে আপনি একটু পানি পড়া দেন । হুজুর বলে আমি তো আল্লাহর নাম নিয়েই
পানি পড়া দিব । তুমিও আল্লাহর নাম নিয়ে দিলে হবে । হুজুর দিলে হবে এটা ঠিক না । তোমার বাসার ঐ পাগল ছেলেটা আমাকে সত্য শিক্ষা দিয়েছে । মা গো যার চলে যাবার সময় হবে সে তো চলেই যাবে । সেটা গাছ হউক আর মানুষ হউক । নাদিয়া আর কিছু বলে না । সে তার পড়ার টেবিলে বসে মরা শিমুল গাছটা দিকে চেয়ে তার সেই পাগল ভাইটার কথা ভাবতে লাগল । প্রায় সময় কিছু হলে নাজু নাদিয়া নাজ এক সাথে বলে লিখে রাখি ভাইয়া আসলে বলতে পাড়বে । শীত বসন্ত শেষ গরম পরেছে ।
পুকুর ঘাটে বসে শিলা কচ্ছপ গুলো দেখে তার পাগল জিনিয়াস মামা ২০ টা কচ্ছপ ছেড়েছে এই পুকুরে ।। নাদিয়া খুব আশাবাদী প্রাইভেট পরীক্ষায় সে এবার বি , এ পাস করবে ।।
ডাঃ জীবন শেষ পর্যন্ত দিলরুবা কে বিয়ে করে ঘরে তুলেছে । ধীরে ধীরে দিলরুবা আর ডাঃ জীবন আরো সুন্দর হয়েছে । দিলরুবা ডাঃ জীবন কে তার ভালবাসা আর
ব্যবহার দিয়ে মুগ্ধ করেছে । দিলরুবা যথেষ্ট সম্মান করে স্বামী হিসাবে । ডাঃ জীবন
মাঝে মাঝে বলে কি দিলরুবা আমাকে তো বললে না তোমার মনে এত সাহস কে দিল।
আমার জানতে ইচ্ছা হয় তোমার মনের শক্তির উৎস কি ? দিলরুবা মিষ্টি করে হেসে
বলে তোমার ভালবাসা আর আমার বিশ্বাস এই দুই মিলে আমার শক্তি , মনে মনে পাগলের কথা ভাবে । কি অবাক করা একটা মানুষ । নীরবে তার কত উপকার করে গেল । মনে মনে সে বলে ইস একদিন যদি দেখা হত । একটু পা ছুয়ে সালাম করে নিতাম । সে নাদিয়ার কাছে জেনেছে যেই পথে এসেছে সেই পথে হারিয়ে গেছে । ভাল মানুষ গুলো কি এভাবেই হারিয়ে যায় । নাকি তারা অন্য কোন গ্রহ থেকে আমাদের দুঃখ গুলো দূর করতে আসে মানুষ সেজে ।।
রাত অনেক । খুব গরম পরেছে । পাগলের পরনে একটা ফুল হাতা সোয়েটার । মাথায়
একটা কাপড় বাধা । আখাউরা রেল ষ্টেশনে দাড়িয়ে আছে । সবাই যখন গরমে অস্থির । সে দিব্বি চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে । একজন বলল ভাই আপনার কি শরীরে জ্বর । পাগল বলল – আপনি কি করে জানলেন যে আমার জ্বর ।
—– না মানে এই গরমে আপনি সোয়েটার পড়ে আছেন ।
—- আরে ভাই গরমে না। শীত চলে গেল না বলে । বসন্ত চোখে দেখলাম না ।
কাপড় রাখার ব্যাগ নাই । আমার মিলি খালা এই সোয়েটার কিনে দিয়েছিল ।
কোথাও রাখলে যদি হারিয়ে যায় । পড়ে তো কিনতে পারব না।
—- আপনি মানুষ না পাগল ? গরম লাগে না ।
—- ভাই গরীব মানুষের শীত গরম নাই । এক ভাবে জীবন গেলেই হল ।
—- তা কি কাজ করেন ।
—- যখন যে কাজ পাই করি । কাজে কোন নিন্দা নাই ।
—– ভাল তুমি কি রান্না বান্না জানো ।
—– পাগল একটু হেসে বলে দুনিয়া টা হল সব খাবারের জন্য পাগল । যদি
খাবার রান্না না করতে পারি জীবন ষোল আনা মিছা ।
—– পাগল কে লোকটা বলল ভাই আমি ঢাকা এক সাহেবের বাসায় দারোয়ানির
চাকুরি করি । আমাকে গ্রামে পাঠাইছে একটা বাবুর্চি নিতে । কিন্তু কোথাও
পেলাম না । বাবুর্চি না নিলে চাকুরি থাকবে না। তুমি ভাই চাকুরি টা করলে
আমার চাকুরি টা বাচে । বেতন ভাল থাকা খাওয়া ফ্রি । জামা কাপড় পাইবা ।
—- পাগল বলল আপনার স্যার তো আমাকে অনেক প্রস্ন করবে । গ্রাম কোথায় ।
আগে কোথায় কাজ করেছ ।
—- আরে মিয়া আমি কি বোকা নাকি । তোমাকে সব শিখিয়ে নিব । আগে বল
যাবে কি না ।
—- আমি তো ভাই চোর ডাকাত হতে পারি ।
—- দেখ ভাই তোমার কথা ঠিক । তবে তুমি চোর ডাকাত হলে গরমের মধ্যে
সোয়েটার পড়ে থাকতে না।
—– পাগল একটু হেসে বলল আপনি ঠিক বলেছেন । এই দেশের চোর বাটপার রা
এসি রুমে ঘুমায় । এসি করা গাড়িতে ঘুরে ।
—- পাগলের পিঠে হাত দিয়ে দারোয়ান বলল ঠিক কইছ ভাই । আমার নাম
জাফর ।তোমার নাম কি ?
—- পাগল একটু হেসে বলল আমার নাম অ-মানব । এখনো মানব হতে পারি নাই ।
—- জাফর বলল ভাই নামটা তো চমৎকার । চল ভাই আ-মানব । ট্রেন আসছে উঠে
পর ঢাকা যাই ।
অ-মানব জাফরের সাথে বাবুর্চির চাকুরি নিয়ে ঢাকা রওনা দিল …….।
চলমান —–

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!