শাহ মোহাম্মদ ইমরান এর লেখা- বিচার চাই

বিচার চাই
-শাহ মোহাম্মদ ইমরান

প্রতিদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরবার পথে ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলের দেয়ালে আকা গ্রাফিতিতে মুগ্ধকে দেখি “ পানি লাগবে পানি”। আমি জানি মুগ্ধ শহিদ হয়েছে কিন্তু যতবার দেখি মনে হয় মুগ্ধ বেচেই আছে , সবাইকে ডেকে পানি দিচ্ছে ।
বুকটা ধক করে ওঠে ভুল জানতাম তা হলে। এই ভুল জানার যে কী আনন্দ! ‘মৃত’ মানুষ রাস্তায় দাড়িয়ে আছে , গায়ে হাওয়া লাগছে, সুর্যের আলো এসে পড়ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে, রোদে শুকাচ্ছে জীবনের সব লক্ষণই তো আছে।
রিকশায় এক বাবা তার সন্তানদের বলছেন কিভাবে মুগ্ধ পানি দিতে গিয়ে মারা গিয়েছে । পানি হ্যা পানি পানির অপর নাম জীবন পৃথিবীর তিন ভাগ পানি একভাগ স্থল, পৃথিবী পানিময় ।

একবার বাসায় পুরনো বাক্সে ছোট বেলার কিছু জিনিস খুজে পেয়েছিলাম, গল্পের বই, পুরনো খাতা , খাতায় আধা পাতা লেখা, হাতের লেখার খাতা, শেষ না করা অংক, আকা বাকা কিছু আকা ড্রইং খাতা, রঙ পেন্সিল, আরও অনেক কিছু । অনেক স্মৃতি অনেক মানুষের হাতের ছোয়া । পুরস্কার হিসেবে পাওয়া
বই, ঝর্ণা কলম, ডাইরি, পেন্সিল কাটার।
পুরনো জিনিসের গন্ধ আছে , গন্ধটা কেমন আমি জানি না, হয়তো ছোটবেলায় শোনা কোনও গানের মতো,গানেরও গন্ধ আছে সুরে আর কথার টানে গন্ধ চলে আসে নইলে বুকের ভেতরে এমন জাঁকিয়ে বসে কী করে?
আমার ছোটবেলার গন্ধ, স্কুলের গন্ধ, হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের গন্ধ, দাদার লেখা চিঠি, নানার কিনে দেয়া বই, মামা বাড়ির গন্ধ, চাচাত মামাত ভাই বোনদের গন্ধ , বই এর পাতায় রেখে দেয়া ময়ূরের পালক, চাপা দেয়া গোলাপ, বল, মার্বেল কত কিছু ।

খুব সাধারণ জিনিস ছোট বেলার স্মৃতি কিন্তু যেন গত জন্মের কেউ।
আসলে গত জন্ম বলে কিছু হয় না, কিন্তু মানুষ তার কোষ কলা অস্থিতে রোজ গত জন্মকে তা দেয়, তার ডিম ফোটে বাচ্চা দেয়, তারপর একদিন ফুরুত করে উড়ে যায় আকাশে। কিন্তু ঐ নিভৃত পদ্ম লাগী রোজ বিবাগী হয় মন ভ্রমর, তার ডানায় বীণা বাজে , গত জন্মের বীণা , গত জন্মের ধুকপুক ধুকপুক ।

এই পুরনো বাক্সে খুজে পাওয়া জিনিস গুলো সবই গত জন্মের বন্ধু বান্ধব, সবারই এমন প্রিয় জিনিস থাকে , হারিয়ে যায় আবার খুজে পায় রেখে দেয় আবার হারায় আবার খুজে পায় ।

জীবন তো থেমে নেই, জীবন চলছে , এমন অনেক কিছুই হারিয়ে গিয়েছে যা আর ফিরে আসবেনা। ছোটবেলায় আমাদের গ্রামে এক মহিলাকে দেখা যেত তার ৮/৯ বছরের বাচ্চা মারা যাবার পরে উনি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। স্কুল পড়ুয়া সব বাচ্চা কেই উনি নিজের ছেলে মনে করতেন , পেছনে পেছনে বাবা বাবা করে ডাকতেন ,বাচ্চারা কেউ তাকে মা মনে করত না, ভয় পেত।

আমাদের পাড়ায় এক মা তাঁর ‘মৃত’ সন্তানকে খুঁজে পেয়েছিলেন। ছেলেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল, অনেক ছেলেকেই ধরে নিয়ে গিয়েছিল, ছেলে আর ফেরে না, অনেকের লাশ পাওয়া গিয়েছে ছেলের লাশ আর পাওয়া যায় নি । তারপর মায়ের পথ চেয়ে থাকা। যদি ছেলে ফেরে। কিন্তু ফেরে আর না। সত্যিই মারা গিয়েছে? ছেলে মরে গেছে তাও ভাবতে পারছেন না , আবার ছেলে ফিরে আসে না , ৭১ সালে যুদ্ধ শেষ হয়েছে কয়েক বছর চলে গিয়েছে ছেলে ফিরে আসে না ।
বহুদিন পর রাতের বেলায় শোনা গেল ডাক, ‘মা ও মা।’ মা শিউরে উঠল। বাইরে বেরিয়ে দেখে, ছেলে ফিরেছে। মায়ের বুকে ঝড়। পৃথিবী ওলটপালট। রাতের অন্ধকার চিরে শুধু ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ। ভাই বোন মা সবাই কাদছে।

১৯৭৪ সালে রেড ক্রসের কল্যাণে অনেক বাঙালী ফিরে এসেছিল, ছেলেও ফিরেছিল।

আচ্ছা মুগ্ধ, আবু সাঈদ, ফাইয়াজ, মারুফ, কি বলব এপর্যন্ত ১৫৮১ জনের খসড়া পরিচয় পাওয়া গিয়েছে আরও কত অসংখ্য অজানা রয়েছে , এদের কেউ কি কোনদিন ফিরবে?
এদের মা বাবা ভাই বোন আপন জন এদের কি মনে মনে খোজে ? অবশ্যই খোজে, ফাইয়াজ এর মায়ের লেখায় পড়েছি , উনি লিখেছেন “”জানো বাবা, সেদিন বাজার করতে গিয়ে যেই চকোলেট এর শেল্ফ এর সামনে দিয়ে যাচ্ছি- আমি দেখতে পেলাম ঠিক তুমি দাঁড়িয়ে, আর ক্যাডবেরির একটা বড় Silk এর প্যাকেট আমাকে দেখিয়ে বলছো মুনাম্মা নেই এটা?“”
এমন অবস্থা সকল মায়ের, সকল আপন জনের, এমন একটা হেলুসিনেশন তাদের সাড়া জীবন তাড়া করে বেড়াবে ।

কিন্তু এদের ফিরে আসার কথা না ফিরবেও না । বিগত সরকারের সময় আমরা অনেক হত্যাকান্ড দেখেছি, সেগুলোর অনেক গুলোর বিচার হয়নি , মামলার বাদী, সাক্ষী নিজেরাও খুন হয়েছেন, অনেকে সাক্ষ্যও দেবার সাহস পায়নি তাই বিচার হয়েছে কিন্তু সাজা হয় নি সাক্ষ প্রমাণের অভাবে। আবার বিচার হয়েছে কিন্তু রাস্ট্রপতি ক্ষমা করে দিয়েছেন, তাই রায় কার্যকর হয় নি । ধন্য স্বৈরাচারী সরকার ধন্য রাস্ট্রপতি, রাস্ট্র যন্ত্রের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখেছে আদালত, এমন কি প্রধান বিচারপতি দেশ ছেড়ে চলে যাবার ঘটনাও ঘটেছে ।

তাই প্রতিদিন প্রতিক্ষণ বলছি বিচার চাই । গ্রামে গঞ্জে, ট্রেনে, বাসে, মেট্রোতে, লঞ্চে , বন্দরে, অফিস আদালত কিংবা চায়ের দোকান সর্বত্রই একটাই দাবী বিচার চাই ।
কিসের বিচার একদল ছাত্র জনতাকে হত্যার বিচার।

আচ্ছা এদের বাবা, মা, ভাই বোন, আপন জন কি বিচার চাইতে পারছেন ? হয়তো পারছেন না কারণ বিচার চাইতে গেলে নিজের সন্তান বা আপন জনের মৃত্যুকে মেনে নিতে হবে আগে।

কেউ কারও মত হয় না,কেউ মারা গেলে সবাই বলে আমি তোমার বাবার মত মত ভাইয়ের মত সন্তানের মত কিন্তু ছোট শিশুও কাউকে মা হিসেবে মেনে নেয় না । এরা কি করে ভুলবে আপনজনের মৃত্যু।

চোখ ভিজে যাচ্ছে , বুক ভারি হয়ে যাচ্ছে গলা আটকে যাচ্ছে। স্বৈরাচার পালিয়েছে নতুন সরকার এসেছে । সব দাবী দাওয়া একদিন পূরণ হবে, হয়তো বিচার ও হবে সব একদিন থেমে যাবে শুধু আপন জন ফিরবে না।
কয়েকদিন খুব রোদ উঠেছে ঝলমল করেছে চারদিক, টাঙ্গাইল যাচ্ছি ,সাভার, এখানে বিপ্লবীদের পোড়ানো হয়েছিল সড়কের পাশে সাদা কাশবনের ধারে জংলি ফুল। এই শরতে বিপ্লবী সন্তানেরা না-থেকে যায় না। আছে নিশ্চয় দুপুরের রোদে,অথবা বৃষ্টিতে, কাশবন , কিংবা হারিয়ে যাওয়া রেল লাইনে,নদীর পাড়, বাগান অথবা মাঠে, পুকুরের পাড়, স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় , বাসে বা রিকশায় বিপ্লবিরা না থেকে যায় না, বিক্ষোভে-বিদ্রোহে তাদের গলা শোনা যাচ্ছে, আমরা আছি।

আমাদের অফিসে বেশ কয়েকজন অল্প বয়সি ছেলে কাজ করে কতই আর বয়স ২২/২৩, পরাজিত শক্তির দোসর রা নানা যুক্তিতে এই দুর্নীতি আর হত্যা কান্ড কে যৌক্তিক প্রমাণ করার জন্য বলে এগুলো হবারই ছিল রাজনীতি করলে এসব করতে হয়। ছেলে গুলো শোনে , কিছু প্রত্যুত্তর করেনা , হয়তো বয়স কম বা ছোট চাকরি করে স্বৈরাচারের সমর্থকদের অধিনে, তাই ফিসফিসিয়ে বলে বিচার চাই। এদের বিবেক রয়েছে , সত্য মিথ্যা বোঝে, সত্য বলে কোন ঘটনার উদাহরণ ই এই সকল ঘটনাকে জাস্টিফাই করেনা।

অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছি সামনে ভেঙ্গে যাওয়া কড়ই গাছ, তার ওপারে গুলশানের বিলুপ্ত প্রায় ডুপ্লেক্স দোতলা বাড়ি । বায়ে হেটে যাই লেকের ধারে চা কলা সিগারেটের দোকান, দোকানদার আমাকে দেখে হাসে, পাশে আমাকে অবাক করে দিয়ে এই অদিনেও কৃষ্ণ চূড়া ফুটে রয়েছে। দোকানের ক্রেতারা আলাপ করছে কয় জন শহীদ হয়েছে তালিকা বেরিয়েছে, বিচার চাই।

এগিয়ে গুলশান এক নম্বর মোড়ে দাড়াই আজকাল পুলিশের উপস্থিতি তেমন নেই কিন্তু সারি সারি গাড়ি চলছে । একটি গাড়ির সামনের অংশ ভেঙে গিয়ে ইঞ্জিন আর চাকা দেখা যাচ্ছে , পাশে মোটর সাইকেলে এক বয়স্ক ভদ্রলোক যাচ্ছিলেন , ড্রাইভার কে বলেন “” তোমার গাড়ি তো পুরোই ডিজিটাল, এত উন্নয়ন কে করে দিল?”” কূটনৈতিক এলাকা গুলশানের সড়ক গুলোও যথেষ্ট ভাঙা অন্য এলাকা কল্পনাই করা যায় , এই তো উন্নয়ন, এই সম্পর্কে মানুষের ধারণাও তেমন। ভদ্রলোক বলেছেন দেশটার যা হয়েছে গত ১৫ বছরে, তাতে দেশকে অনেক দিন ভুগতে হবে, আর যা গণ হত্যা দুর্নীতি যা করেছে তার বিচার করতে হবে। উনি ও চলে যান আমিও এগোই।

গুলশান থেকে মহাখালী পার হয়ে জাহাঙ্গীর গেটের দিকে যাই দেয়ালে সাজিদ, সেখানে লেখা রয়েছে “আমি ইকরামুল হক সাজিদ , এই কলেজের ছাত্র ছিলাম”। বিজয় স্মরণী হয়ে মানিক মিয়া এভিনিউ দিয়ে ধানমন্ডি ২৭, ফুটপাতে চায়ের দোকান, কয়েক জন বসে আছে সব সময় ই যেমন দেখা যায়। মামা ভাগ্নে চানাচুর গান বাজিয়ে বিক্রি করছে , দিবারাত্র শুধু চানাচুর বেচে কে এত খায় কে জানে। কয়েকজন ফেরিয়ালা সবজি বিক্রেতা সবজি বিক্রি করছেন অর্গানিক সবজি। পেছনে ই সেই অমর শহিদ দের গ্রাফিতি, সেগুল পেছনে ফেলে বাড়ির দিকে যাই ।

ধানমন্ডি ১৫ তে আমার বাসার গলির সামনে ফখরুলের কলার দোকান দেখলেই হাসে, বলে এক ডজন দেই? কোনদিন কিনি কোনদিন কিনিনা ।

এগিয়ে যাই এক ফল বিক্রেতা হেসে বলে ভাল ফল আছে নিয়ে যান । একটু এগোলেই রায়ের বাজার সারি সারি মাছ ,ইলিশ, রুই, কাতল, ভেটকি, মোচন, আইড়, যেন সেনানিবাসে শুয়ে আছে সেনাদল। পদ্মা, মেঘনা, কোন সাগর—কোথায় যেন ছিল সব। আমি নদী-সাগর পেরিয়ে হাঁটি। বাজার ফিকে হয়ে আসে। দোকানপাট কমতে থাকে। তার পর কেউ থাকে না। কুমড়ো ফুল, কচুর ডাঁটি, পাকা তাল, ছোট এক টাকার কয়েন… লেনদেন ফুরিয়ে আসে ,আমি একা।
বদ্ধভূমির সামনে এক বিরাট গাছ, মৃত্যুর মতো, গাঢ় ছায়া অনেকটা জুড়ে। ভয় লাগে।কাছেই প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন নিঝুম। একটু বাদেই তালা খুলবে। গাছের ছায়ায় সব্জীর আড়তে উঠবে হলুদ কুমড়ো ফুল।একটা-দুটো-একশো-দুশো। বিক্রেতাদের হাসি দিগন্তের দিকে এগোয়, আলেয়ার মতো আজ-কাল-পরশু, রোজ। দরাদরি নেই বাপু এক দাম। একটাই জীবন একটাই সুর্যের আলো। ফেরার সময় পালাকীর্তনের শব্দ ভেসে আসে বাতাসে কাছের কোন মন্দির থেকে আজানের আহবানের সাথে সুর মিলিয়ে যেন বলে বিচার চাই । এত দুঃখেও এই শরতে আলো বেঁচে আছে এই বিপ্লবের শহীদ অথবা আহতদের মতো। মানুষ যায়, আলো যায় না। তিরতির করে কাঁপে। জীবন যেন গাড়ির সারি, দোকান দারের হাসি বিপ্লবের গান, বাগানের ফুল…। প্রহর শেষ হয়েও হয় না। আনাচে কানাচে আলো জেগে থাকে।
বিপ্লব দীর্ঘজীবি হয়, বিপ্লবিরা অমর হয়, আমরা অপেক্ষা করছি বিচারের , আরেক বিপ্লবের দিন, আমরা আবার বিপ্লব করার জন্য নামব , আমরা বিচার চাই, বিচার চাই… সন্তান হত্যার বিচার চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!