সেলিনা জাহান প্রিয়ার গল্প: ‘অ-মানব’-অষ্টম পর্ব

‘অ-মানব’-অষ্টম পর্ব

——————— সেলিনা জাহান প্রিয়া

জোছনা চা নিয়ে বলল মামী পাগল কে কি চা দিব ? আজিজ মিয়া বলল যা তো জোছনা যা। চায়ের সাথে কিছু মুড়ি ও দিয়া আয় । পাকিস্তান ২৮৫ রান । আজ তিন শত রানের উপরে করবে । মিলি খেলা দেখেছে আর ভয় পাচ্ছে । জোছনা কে বলল যা চা নিয়ে যা । গিয়ে বল ভারতে অবস্তা ভাল না। আর শোন এটাও বলিস যে ভারত হারলে সকালেই বরিশালের লঞ্চে উঠতে হবে । আজিজ মিয়া মনে মনে আল্লাহ্‌ কে ডাকছে । কারন পাকিস্তান জিতলেই পাগলের হাত থেকে সে বাচঁবে। তাহলে থানার বিষয় টা কেউ জানবে না। জোছনা চা নিয়ে ছাদে গিয়ে দেখে পাগল খুব সুন্দর করে চাঁদের দিকে চেয়ে ধ্যানে বসে আছে । জোছনা কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। পাগল মানুষ কি থেকে কি বলে ? চা নিয়ে পাগলের পিছনে দাড়িয়ে ।

পাগল বলল

–চাদের আলো এসেছ চা নিয়ে
— আপনি দেখলেন কি ভাবে ।আমি তো আপনার পিছনে ।
— তোমার পায়ের শব্দ শুনে বুঝতে পারলাম ।
—সব মানুষের পায়ের শব্দ তো এক রকম হয় ।
— চাঁদের আলো । শোন মানুষের পায়ের শব্দ তাঁর শরীরের ওজনের সাথে কম বশী
হয় ।
— তাই বলে আমি কি করে বুঝলেন । আমি ছাড়া তো অন্য কেউ হতে পারে ।
— তোমার সাথে তোমার মুখের স্নো দিয়েছ সেটার গন্ধ বাতাসে এসেছে ।
— আচ্ছা পাগল ভাই । বলেন তো কি স্নো দেই ।
— তিব্বত স্নো ।
— হ্যা একদম ঠিক । আমার মায়ে দিত। এখনো দেয় । এটা দিলেই আমার মায়ের
মুখটা ভাসে ।। কত দিন হল মাকে দেখি না। আমারা বাড়ির জন্য মনটা কাঁদে ।
— মাকে দেখতে চাও তুমি ।
— কিভাবে দেখব ।
— আমার সামনে এসে আমার মত করে বস । হ্যা । তুমি চা নিয়ে এসেছ । আগে
বলবে না।
— আপনে আমাকে দেখলেন চা দেখলেন না।
— যাদের শ্বাস চলে তাদের দেখা যায় । তুমি চুপ করে বস । এখন চোখ বন্ধ কর ।
আর মনে মনে ভাবতে থাক তুমি গ্রামের বাড়িতে আছ । ভুলে যাও তুমি আমার
সামনে ওকে ।
জোছনা চোখ বন্ধ করে বলছে । আমাদের কাঁঠাল গাছে নতুন মুচি আসছে । মা ঢাকা আসবে বাবার সাথে তাই পিঠা বানাইতাছে । আমার ভাই শীতের মধ্যে আমার দেয়া
একটা সুয়েটার পড়ে আছে । ওর পায়ের ঘা টা নাই । তাহলে বাবা ওরে ডাক্তার দেখাইছে । দেখ দেখ বাবা আবার মায়রে বক্তাছে । বাবা মায়ের বলে ঢাকা আসলে গরু কিনার টাকা চাইতে ।
জোছনা যেন সত্যিই তাঁর বাড়িতে চলে গেছে ।পাগল টা চা খাওয়া শেষ করে বলল –
— চাঁদের আলো , তাকাও , আস্তে আস্তে , তাকাও ।
— জোছনা তাকিয়ে প্রথমে চুপ করে থাকিয়ে বলে । আমি কি ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম ?
— না । চাঁদের আলো তুমি ঘুমাও নেই । তুমি যা জেনেছ তা কিন্তু কাউকে বল না।
— আচ্ছা পাগল ভাই মা কি কাল কে আসবে বাবার সাথে ।
— তুমি যা দেখেছ তা তোমার চিন্তা । বাবা কে একটা গরু কিনে দিলে উপকার হয় । তাই না ।
— গরুর অনেক দাম ।
— চিন্তা কর না তুমি যাও । তোমার দরকার হবে মিলি খালার ।
— আপনার ভারত নাকি হারবে মামী বলছে ।
জোছনা এই কথা বলে চলে যায় । পাগল আবার ধ্যানে বসে পড়ে। ঘরে সাবাই খেলা নিয়ে ব্যস্ত । জোছনা ভাবতে থাকে । আমি কি দেখলাম । আমার ভায়ের শরীরে যে সুয়েটার এই টা আমি কয়দিন আগে দিয়েছি । আজিজ মিয়া মিলি কে বলে দেখ তোমার ভারতের ১০ ওভারে দু জন নাই । জোছনা চিন্তায় পড়ে গেল যদি মামী হারে তাহালে তো পাগল কে যেতে হবে । মিলি চুপ করে তাঁর ঘরে গিয়ে
ছাদে যে ভাবে বসে ছিল । ঠিক সেই ভাবে বসে খেলা শেষ অবস্তা চিন্তা করছে । মিলি দেখছে ৪ বলে
১০ দরকার । আরও একটা উইকেট পড়ে গেল । ৩ বলে ১০ দরকার । নতুন খেলোয়াড় প্রথম বলেই
ছয় । এখন ২ বলে চার লাগবে । আবার বল করতেই ৪ মেরে দিল । ৩১৭ রানে ভারত জিতে গেল । মিলি চিৎকার দিল । মামী আপনে জিতে গেছেন । মিলি খেলা রেখে জোছনার ঘরে এসে দেখে জোছনা
হাসছে । মিলি বলল – আমি হারলে তো খুশি । জোছনা বলে – ভুল হইছে । আমার মনে হয় আপনি ই জিতবেন ,
— হ্যা পাগলের কথা তাই না জোছনা ।
— মামী আমার মনের কথা ।
— তাহালে আয় খেলা দেখি ।
খেলা চলছে । দারুন জমেছে । ৪ বলে ১০ দরকার । বল করতেই উইকেট পড়ে গেল । মিলি খুব হতাশা
ইস আর একটু হলেই জিতে জেট । জোছনা বলল মামী – পরের বলে ৬ তাঁর পর ৪ । আমার মন বলছে ।
আজিজ মিয়া বলল- পাগলের টিকেট কাট । পাকিস্তানের বল । এটা আনাড়ি পিলিয়ার । বল মারতেই ৬
আর দর কারকার ২ বলে চার । মিলি একটু সাহস পেল । বল করল এবং ৪ রান । মিলি আর জোছনা একসাথে জিতে গেছি । আজিজ মিয়া মাথা নিচু করে বলল- তোমার পাগল জাদু করেছে । যাই ঘুমাতে ।পাগলের দল জিতে গেল । জোছনা বলল মামী আমি কি পাগল কে বলে আসব । যে আমরা জিতে গেছি ,
— হ্যা বলে আয় । যে তাঁর যাওয়া লাগবে না। ফ্রিজ থেকে বিক্রম পুরের দই মিষ্টি নিয়ে যা প্লেটে করে । এক বোতল পানি দিয়ে আয় ।
জোছনা ছাদে এসে দেখে পাগল সেই কুয়াশার মধ্য বসে ধ্যান করছে । মিলি এখন খুব আস্তে আস্তে এসে পিছনে দাঁড়ালো । পাগল হেসে বলল – মিষ্টি আর দই আমার খুব প্রিয় ।
— পাগল ভাই । আপনের সাথে জিন আছে ।
— জীন আছে । হ্যা এই শীতের মধ্য একটা ফতুয়া পড়ে বসে আছেন ।মামী দেখলে আপনার খবর
আছে । জানেন না তো । আশপাশের সবাই মামী কে ভয় পায় । মামীর খুব সাহস ।
— অনেক সাহস ।
— হ্যাঁ অনেক সাহস ।
— তাহালে তেলাপোকা দেখলে তোমাকে ডাকে কেন ।
— হ , তেলাপোকা খুব ভয় পায় ।
— তুমি ভয় পাওনা কেন ।
— আমি তো গ্রামের মানুষ তাই ।
— ওহ জোছনা তাই তাহালে তুমি মিলি খালার মায়েরে ভয় পাও ।
— মাগো ! আপনে আসতে না আসতে দেখি সব জেনে গেছেন । আচ্চা যাই । পানির বোতল আপনার ঘরে রেখে গেলাম । ছাদের লাইট নিভিয়ে দিয়েন ।। দরজা ভাল করে লাগিয়ে ঘুমিয়েন ।
পাশের ছাদ থেকে চোর আসতে পারে । আমি যাই । খেলায় ভারত জিতেছে ।
পাগল উঠে দাঁড়ায় । পাশের বাসার এক মহিলা বার বার দেখছে । পাগল কে । সে আর তাঁর স্বামী কে বলছে- মিলি ভাবির স্বভাব আর ভাল হল না । চিনা না জানা নাই । একটা পাগল কে বাড়িতে জায়গা দিছে । মিলি ভাবির বুঝা উচিৎ । এত বড় মেয়রটাকে দিয়ে আবার এত রাতে খাবার পাঠাইছে । কখন যে কি হয় । কে জানে । ভদ্র মহিলার স্বামী বলে – মিলি আপা অনেক ভাল। ৩০ বছর যাবত চিনি । যে কোন মানুষের দুঃখ কষ্টের সময় তাকে পাওয়া যায় । তোমাদের মত না সারা দিন স্নো পাউডার মাখে ।

সে যেটা ভাল মনে করেছে। তাই করেছে । কত মানুষ তো পাগল কে দেখল । কিন্তু মিলি আপা তাকে আশ্রয় দিয়েছে । আল্লাহ্‌ তাঁর ভাল করবে ।
এই পাশের বাসার মহিলার নাম রেজিয়া । তাঁর কাজ মানুষের ভুল গুলো প্রচার করা । মিলি কিন্তু
তাকে খুব পছন্দ করে । যে কোন আচার বানালে তাকে আগে দিবে । মিলির আর খারাপ কথা প্রচার
করে কিন্তু মিলি তা কানে নেয় না। মিলি বলে আসলে তাঁর মনে কোন দুঃখ আছে । হয়ত তাই আবল তাবল করে । পাগল টা কে রেজিয়া আবার যেয়ে দেখল । এবার ধ্যান থেকে উঠে আবার দু হাত দুই দিকে মেলে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে । রেজিয়া এবার জানালা লাগিয়ে দিল ।
রাত ১ টা বাজে পাগল দেখলো চার দিক কুয়াশা পড়ছে । এবার সে ঘরে গেল ।
মিলির স্বামী ভয়ে ভয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরল । এমন ভাব ধরল যে সে ঘুমিয়ে গেছে। মিলি বলল – ঘুমের অভিনয় করে লাভ নেই । আমি তোমাকে থানা পুলিশ নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করব না।
কারন পাগলের কথা নিয়ে তোমার সাথে আমি রাগ করতে পারি না। তুমি আমার স্বামী কেন পাগলের কথায় তোমাকে অবিশ্বাস করব । নারী হয়ে জন্মালে অনেক সময় আগুন খেয়ে হজম করতে হয় । কাছে এসো মাথায় হাত বুলিয়ে দেই বলে মিলি স্বামীর মাথায় হাত বুলাচ্ছে ।
জোছনা আর মিলির মা এক রুমে থাকে । মিলি শুয়ে শুয়ে বলছে দাদি জানো – আমার মা কাল কে আসবে । আমার মন বলছে । কিন্তু একটা কথা দাদি । আমার বাবা একটা গরু হইলে খুব ভাল হইত ।
— মিলির মা জোছনা কে বলে এখন আমার পা গুলি টিপে দে । তোর বাবা অনেক ভাল মানুষ ।
আমার বাবার বাড়িতে তোর দাদার সাথে ছোট বেলা আসতো । আমার একটা ভাইয়ের সাথে খুব
খেলত । আমাদের একটা গাভি গরু ছিল মাজে মাজে ঘাস কেটে নিয়ে আসতো । আমি তখন বলতাম তোর বাবাকে যে একটা গরুর বাচ্চা দিব । সেই লোভে তো বাবা আমার অনেক কাজ করে দিত । তুই ভাল কথা মনে করছস । এখন তুই ঘুমা । যদি তোর বাপ আসে আমারে মনে করে দিস আমার সেই বাড়ির কথাটা ।।
সুন্দর শীতের সকাল খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে পাগল মানুষটা একটা ছাদে হাঁটাহাঁটি করে গত রাতে যেই ভাবে দাড়িয়ে ছিল ঠিক সেই ভাবে আগের জায়গায় এসে দাঁড়ালো । মিলির বাসার কেউ এখনো ঘুম থেকে উঠে নাই । পাশের বাসার ভদ্রলোকের অফিস এবার গাজিপুর । তাই একটু সকালে যেতে হয় । প্রতিদিন সকালে রেজিয়া বেগম স্বামীরর জন্য গরম ভাত রান্না করে হট পটে ভড়ে দেয় । সকালে তাই চুলা জালাতে গিয়ে জানালা খুলে বোকার মত চেয়ে আছে । আর মনে মনে বলছে পাগলটা সারা রাত এই শীতের মধ্যে দাড়িয়ে আছে । এটা কি মানুষ না ভুত নাকি জীন । ভয়ের রান্না ঘরের জানালা লাগিয়ে দিয়েছে…………।।

চলমান….

অ-মানব-প্রথম পর্ব

অ-মানব-চতুর্থ পর্ব

অ-মানব-পঞ্চম পর্ব

অ-মানব- ষষ্ঠ পর্ব

অ-মানব-সপ্তম পর্ব

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!